বিয়ের সময় হযরত মা আয়েশা (রা)-এর বয়স ছয় বছর ছিল মর্মে প্রচলিত তথ্যটি ভুল

মহানবী (সা)-এর সাথে বিয়ের সময় হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা)-এর সঠিক বয়স কত ছিল? মুনাফিক ও অজ্ঞ লোকদের ধুম্রজাল সৃষ্টির দাঁতভাঙ্গা জবাব:

লিখেছেন : প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
~
হাবিবুল্লাহ হুজুরেপাক (সাঃ) সম্বন্ধে বলা হয় তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে আয়েশার ৬/৯ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন। অথচ আমি অনুসন্ধান করে দেখতে পেলাম হাবিবুল্লাহ হুজুরেপাক (সাঃ)-এর সাথে বিয়ের সময় হযরত আয়শা (রাঃ)-এর বয়স মাত্র ৬/৯ বছর ছিল মর্মে তথ্যটি মস্তবড় এক ঐতিহাসিক ভ্রান্তি।

~
অনেকে ইমাম বুখারীর বর্ণিত একটি মওকূফ হাদিসের উপর ভিত্তি করে হযরত মা আয়েশা (রা)-এর বিয়ের বয়স ৬ বছর ছিল বলে মনে করে থাকেন। অথচ উক্ত তথ্যটি একদিকে ঐতিহাসিক ভাবে অপ্রমাণিত, অপরদিকে হাদিসটির সনদের ভেতর হিসাম ইবনে উরওয়া নামের একজন রাবি সম্পর্কে ইমাম মালেক (রহ) বলেছেন, সে শেষ বয়সে ( তথা ৭১ বছর বয়সে) মদিনা থেকে ইরাক চলে যাওয়ার পর স্মৃতিশক্তি হারিয়ে পেলেছিল। ফলে তার বর্ণনায় অনেক কিছুই উল্টোপাল্টা হয়ে যেত। সেজন্য তার থেকে কোনো ইরাকী রাবি যত হাদিসই বর্ণনা করবে, সেগুলো গ্রহণযোগ্য হবেনা।”
[তাহযীবুত তাহযীব, লেখক ইবনে হাজার আসকালানী (রহ)]
সহীহ বুখারী, মুসলিম সহ অনেক হাদীসগ্রন্থে হিসাম ইবনে উরওয়া সূত্রে হযরত আয়েশা (রাঃ) এর বয়স নিয়ে যে তথ্য এসেছে, তা হিসাম ইবনে উরওয়াহ (রহ) কর্তৃক বর্নিত একটি মওকূফ বর্ণনারই উৎস। প্রায় ৫-টি সনদে হযরত আয়েশা (রাঃ) এর বয়স সম্পর্কিত রেওয়ায়েত উল্লেখ রয়েছে, সবই হিসাম ইবনে উরওয়াহ (রহ) কর্তৃক বর্নিত। হিসামের বর্নিত ওই ৫-টি সনদে মদিনার কোনো রাবী (বর্ণনাকারী)’র সংশ্লিষ্টতা নেই।
হিসাম ইবনে উরওয়াহ’র ভাষ্য : ﻓﻲ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﺃﻥ ﺍﻟﺮﺳﻮﻝ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﺗﺰﻭﺝ ﺃﻡ ﺍﻟﻤﺆﻣﻨﻴﻦ ﻋﺎﺋﺸﺔ ﻭ ﻫﻲ ﺍﺑﻨﺔ ﺳﺖ ﺳﻨﻮﺍﺕ ﻭ ﺩﺧﻞ ﺑﻬﺎ ﻭ ﻫﻲ ﺍﺑﻨﺔ ﺗﺴﻊ
রাবি হিসাম ইবনে উরওয়াহ (রহ) কর্তৃক বর্ণিত রেওয়ায়েতটি সম্বন্ধে সংশয় প্রকাশ করার মতো যথেষ্ট কারণও বিদ্যমান। তন্মধ্যে প্রথম কারণটি হল, হাদীসের কোনো বিষয় বা হাবিবুল্লাহ হুজুরেপাক (সাঃ)-এর জীবন-যাপন পদ্ধতি কোনোভাবেই পবিত্র কোরআনের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারেনা।
কাজেই বিবাহযোগ্য বয়সের বিষয়ে আল কোরআনের যে নির্দেশ রয়েছে, উক্ত মওকূফ বর্ণনা নির্ভর তথ্যটি সেই নির্দেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাহলে? উত্তর একটাই। উক্ত মওকূফ বর্ণনা-নির্ভর তথ্যটি সঠিক নয়; সঠিক হতেই পারেনা।

হিসাম ইবনে উরওয়া হতে উক্ত বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কতেক কারণ নিম্নরূপ —
হাবিবুল্লাহ হুজুরেপাক (সা) পবিত্র কুরআনের আদর্শেই জীবন পরিচালিত করতেন। তার জীবনাদর্শ সর্বকালের মুসলমানদের জন্য অনুকরনীয়। তিনি কোরানের পরিপন্থি কোনো কাজ করতে পারেন না। পবিত্র কুরআন থেকে বিবাহের যোগ্যতা বা উপযুক্ত বয়সের যে দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় , তাতে এটা প্রতীয়মান হয় যে, শিশুবিবাহ ইসলামে নেই।
সূরা নিসা (০৪:০৬) অর্থাৎ, আর এতীমদের প্রতি বিশেষভাবে নজর রাখবে যে পর্যন্ত না তারা বিয়ের বয়সে পৌঁছে। তখন তাদের মধ্যে বুদ্ধি-বিবেচনার উন্মেষ আঁচ করতে পারলে, তবেই তাদের সম্পদ তাদের হাতে অর্পন করতে পার।”
♣ এর অর্থ একটাই, বুদ্ধি-বিবেচনাহীন কেউ বিবাহযোগ্য নয় । তার মানে যিনি বুদ্ধি-বিবেচনা সম্পন্ন তিনি প্রাপ্তবয়স্কা।
যাইহোক, যারা আগ্রহী তারা পবিত্র কুরআনের ৪: ২১ , ৩০: ২১ ও ২৫: ৭৪ আয়াতগুলোও পড়ে দেখতে পারেন। এ আয়াতগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যায় গেলাম না। কারণ ধর্মহীন ভ্রষ্ট নাস্তিকরা পবিত্র কুরআনে বিশ্বাস করে না।
~
আর যেহেতু হাবিবুল্লাহ হুজুরেপাক (সা)-এর প্রতি কথিত ‘শিশুবিবাহ’ এর কল্পিত অভিযোগটি ধর্মহীন ভ্রষ্ট নাস্তিকরাই করে, যার ভিত্তি হল বুখারির বরাতে হিসাম ইবনে উরওয়া হতে বর্ণিত একটি বর্ণনা, সেহেতু সেই হিসাম ইবনে উরওয়া সম্পর্কে এখানে কয়েকটি কথা আলোচনা করব। যার ফলে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, উরওয়া হতে বর্ণিত উক্ত বর্ণনাটি অগ্রহণযোগ্য।
~
ইমাম বুখারী (রহ) এর কিতাবটির হাদিসগুলোর সনদের বিশুদ্ধতার উপর সব মুহাদ্দিসই একমত। তথাপি আল্লামা ইমাম ইবনে জওযী (রহ) সহ দু’ এক হাদিস বিশারদ ইতিপূর্বেও বুখারীর কয়েকটি হাদিসের সনদ সম্পর্কে আপত্তি তুলার প্রমাণ পাওয়া গেছে ।
প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা ইমাম ইবনে জওযী (রহ) [মৃত ৫৯৭ হিজরী] দ্বু’আফা ওয়াল মাতরুকীন কিতাবে বুখারীর প্রায় ১৮-টি হাদিসকে সূত্রের দিক থেকে দুর্বল বলেছেন। হিসাম ইবনে উরওয়া কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি তন্মধ্যে একটি। বিস্তারিত নিম্নরূপ –
১-
এ হাদীসটির বর্ননাকারীদের শেষ ব্যক্তি হিসাম ইবনে উরওয়া । তিনি তার পিতা থেকে হাদীসটি শুনেছিলেন। হাদীসটি মূলত খবরে ওয়াহিদ স্তরের একটি হাদীস। হিসাম ইবনে উরওয়া তিনি তার জীবনের প্রথম ৭১ (একাত্তর) বছর মদিনায় কাটালেও এ মর্মে কোনো হাদীস মদিনার কেউ তার নিকট থেকে শোনেনি। এমনকি তার বিখ্যাত ছাত্র হযরত মালিক বিন আনাস (রহ)ও এরকম কোনো হাদীস উল্লেখ করেননি। হিসাম ইবনে উরওয়া তিনি জীবনের শেষ দিনগুলো ইরাকে অতিবাহিত করেন । একারণেই হাদীসটির বর্ননাকারীদের অবশিষ্ট সকলেই ইরাকের অধিবাসী।
~
√ ইমাম ইয়াকুব ইবনে শাইবাহ (রহ) বলেছেন :
“হিসাম ইবনে উরওয়া’র যেসব হাদিস ইরাকিরা বর্ণনা করেন শুধুমাত্র সেগুলো ছাড়া সকল হাদীসই বিশ্বাসযোগ্য ।”
√ মালিক বিন আনাস, যিনি হিসাম ইবনে উরওয়া’র ছাত্র ছিলেন, তিনি ইরাকিদের মাধ্যমে বর্ণিত হিসামের হাদীসগুলোকে সন্দেহ করে সেগুলো বাতিল করে দেন। মালিক বিন আনাস (রহ)-এর বক্তব্য :
ﺃﻥَّ ﺍﻹﻣﺎﻡ ﻣﺎﻟﻚ ﻗﺎﻝ: ﺇﻥَّ ﺣﺪﻳﺚ ﻫﺸﺎﻡ ﺑﺎﻟﻌﺮﺍﻕ ﻻ ﻳﻘﺒﻞ .
(সুত্র – তাহযীবুত তাহযীব, লেখক ইবনে হাজার আসকালানী (রহ); বইটি হাদীস বর্ণনাকারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে লেখিত।)
২-
হিসাম ইবনে উরওয়া তিনি শেষ বয়সে স্মৃতিশক্তির দুর্বলতায় ভুগেছিলেন। যেকারণে তার শেষ বয়সের অর্থাৎ ইরাকে বসবাসকালীন সময়ে বর্ণিত হাদীসগুলোর উপর আস্থা রাখা যায় না।
(সুত্র- ইমাম যাহাবী (রহ) লেখিত মিযানুল ই’তিদাল দ্রষ্টব্য। বইটি হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবনী নিয়ে লেখিত)।
~
√ শাইখুল হাদিস প্রফেসর আল্লামা আল-বুহাইরী আস-সউদী (দা: বা:) হিসাম ইবনে উরওয়ার শেষ বয়সে স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা সম্পর্কে লিখেছেন :
ﺃﻥَّ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﺍﻟﺬﻯ ﺫﻛﺮ ﻓﻴﻪ ﺳﻦ ﻋﺎﺋﺸﺔ ﺟﺎﺀ ﻣﻦ ﺧﻤﺴﺔ ﻃﺮﻕ ﻛﻠﻬﺎ ﺗﻌﻮﺩ ﺇﻟﻰ ﻫﺸﺎﻡ ﺑﻦ ﻋﺮﻭﺓ، ﻭﺃﻥَّ ﻫﺸﺎﻡ ﻗﺎﻝ ﻓﻴﻪ ﺍﺑﻦ ﺣﺠﺮ ﻓﻰ ( ﻫﺪﻱ ﺍﻟﺴﺎﺭﻱ) ﻭ( ﺍﻟﺘﻬﺬﻳﺐ): “ﻗﺎﻝ ﻋﺒﺪﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﺑﻦ ﻳﻮﺳﻒ ﺑﻦ ﺧﺮﺍﺵ ﻭﻛﺎﻥ ﻣﺎﻟﻚ ﻻ ﻳﺮﺿﺎﻩ، ﺑﻠﻐﻨﻲ ﺃﻥَّ ﻣﺎﻟﻜﺎً ﻧﻘﻢ ﻋﻠﻴﻪ ﺣﺪﻳﺜﻪ ﻷﻫﻞ ﺍﻟﻌﺮﺍﻕ، ﻗﺪﻡ -ﺟﺎﺀ – ﺍﻟﻜﻮﻓﺔ ﺛﻼﺙ ﻣﺮﺍﺕ – ﻣﺮﺓ- ﻛﺎﻥ ﻳﻘﻮﻝ : ﺣﺪﺛﻨﻲ ﺃﺑﻲ، ﻗﺎﻝ ﺳﻤﻌﺖ ﻋﺎﺋﺸﺔ ﻭﻗﺪﻡ -ﺟﺎﺀ – ﺍﻟﺜﺎﻧﻴﺔ ﻓﻜﺎﻥ ﻳﻘﻮﻝ : ﺃﺧﺒﺮﻧﻲ ﺃﺑﻲ ﻋﻦ ﻋﺎﺋﺸﺔ، ﻭﻗﺪﻡ ﺍﻟﺜﺎﻟﺜﺔ ﻓﻜﺎﻥ ﻳﻘﻮﻝ : ﺃﺑﻲ ﻋﻦ ﻋﺎﺋﺸﺔ .”
ﻭﺍﻟﻤﻌﻨﻰ ﺑﺒﺴﺎﻃﺔ ﺃﻥَّ ( ﻫﺸﺎﻡ ﺑﻦ ﻋﺮﻭﺓ) ﻛﺎﻥ ﺻﺪﻭﻗﺎً ﻓﻰ ﺍﻟﻤﺪﻳﻨﺔ ﺍﻟﻤﻨﻮﺭﺓ، ﺛﻢ ﻟﻤﺎ ﺫﻫﺐ ﻟﻠﻌﺮﺍﻕ ﺑﺪﺃ ﺣﻔﻈﻪ ﻟﻠﺤﺪﻳﺚ ﻳﺴﻮﺀ ﻭﺑﺪﺃ ( ﻳﺪﻟﺲ) ﺃﻯ ﻳﻨﺴﺐ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﻟﻐﻴﺮ ﺭﺍﻭﻳﻪ، ﺛﻢ ﺑﺪﺃ ﻳﻘﻮﻝ ( ﻋﻦ) ﺃﺑﻲ، ﺑﺪﻻً ﻣﻦ ( ﺳﻤﻌﺖ ﺃﻭ ﺣﺪﺛﻨﻲ)، ﻭﻓﻰ ﻋﻠﻢ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﻛﻠﻤﺔ ( ﺳﻤﻌﺖ) ﺃﻭ (ﺣﺪﺛﻨﻲ) ﺃﻗﻮﻯ ﻣﻦ ﻗﻮﻝ ﺍﻟﺮﺍﻭﻱ (ﻋﻦ ﻓﻼﻥ) ، ﻭﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﻓﻰ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻫﻜﺬﺍ ﻳﻘﻮﻝ ﻓﻴﻪ ﻫﺸﺎﻡ ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﻭﻟﻴﺲ (ﺳﻤﻌﺖ ﺃﻭ ﺣﺪﺛﻨﻲ)، ﻭﻫﻮ ﻣﺎ ﻳﺆﻳﺪ ﺍﻟﺸﻚ ﻓﻰ ﺳﻨﺪ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ،
ﺛﻢ ﺍﻟﻨﻘﻄﺔ ﺍﻷﻫﻢ ﻭﻫﻲ ﺃﻥَّ ﺍﻹﻣﺎﻡ ﻣﺎﻟﻚ ﻗﺎﻝ: ﺇﻥَّ ﺣﺪﻳﺚ ﻫﺸﺎﻡ ﺑﺎﻟﻌﺮﺍﻕ ﻻ ﻳﻘﺒﻞ .
ﻓﺈﺫﺍ ﻃﺒﻘﻨﺎ ﻫﺬﺍ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﺍﻟﺬﻯ ﺃﺧﺮﺟﻪ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻟﻮﺟﺪﻧﺎ ﺃﻧَّﻪ ﻣﺤﻘﻖ، ﻓﺎﻟﺤﺪﻳﺚ ﻟﻢ ﻳﺮﻭﻩ ﺭﺍﻭ ﻭﺍﺣﺪ ﻣﻦ ﺍﻟﻤﺪﻳﻨﺔ، ﺑﻞ ﻛﻠﻬﻢ ﻋﺮﺍﻗﻴﻮﻥ ﻣﻤﺎ ﻳﻘﻄﻊ ﺃﻥَّ ﻫﺸﺎﻡ ﺑﻦ ﻋﺮﻭﺓ ﻗﺪ ﺭﻭﺍﻩ ﺑﺎﻟﻌﺮﺍﻕ ﺑﻌﺪ ﺃﻥ ﺳﺎﺀ ﺣﻔﻈﻪ، ﻭﻻ ﻳﻌﻘﻞ ﺃﻥ ﻳﻤﻜﺚ ﻫﺸﺎﻡ ﺑﺎﻟﻤﺪﻳﻨﺔ ﻋﻤﺮﺍً ﻃﻮﻳﻼً ﻭﻻ ﻳﺬﻛﺮ ﺣﺪﻳﺜﺎً ﻣﺜﻞ ﻫﺬﺍ ﻭﻟﻮ ﻣﺮﺓ ﻭﺍﺣﺪﺓ، ﻟﻬﺬﺍ ﻓﺈﻧَّﻨﺎ ﻻ ﻧﺠﺪ ﺃﻱَّ ﺫﻛﺮ ﻟﻌُﻤْﺮِ ﺍﻟﺴﻴﺪﺓ ﻋﺎﺋﺸﺔ ﻋﻨﺪ ﺯﻭﺍﺟﻬﺎ ﺑﺎﻟﻨﺒﻲ ﻓﻰ ﻛﺘﺎﺏ ( ﺍﻟﻤﻮﻃﺄ) ﻟﻺﻣﺎﻡ ﻣﺎﻟﻚ ﻭﻫﻮ ﺍﻟﺬﻯ ﺭﺃﻯ ﻭﺳﻤﻊ ﻫﺸﺎﻡ ﺑﻦ ﻋﺮﻭﺓ ﻣﺒﺎﺷﺮﺓ ﺑﺎﻟﻤﺪﻳﻨﺔ، ﻓﻜﻔﻰ ﺑﻬﺎﺗﻴﻦ ﺍﻟﻌﻠﺘﻴﻦ ﻟﻠﺸﻚ ﻓﻰ ﺳﻨﺪ ﺍﻟﺮﻭﺍﻳﺔ ﺍﻟﺴﺎﺑﻘﺔ ﺍﻧﺘﻬﻰ.
ﺃﺧﺘﻢ ﺍﻟﻤﻘﺎﻝ ﺑﻤﺎ ﻗﺪﻣﺘﻪ ﺑﻪ، ﺃﻥَّ ﻫﺬﺍ ﻣﺜﺎﻝ ﻟﻤﺎ ﻳﻤﻜﻦ ﺃﻥ ﻳﺼﻞ ﺇﻟﻴﻪ ﺑﺎﺣﺚ ﻟﻢ ﻳﺘﺨﺮﺝ ﻓﻰ ﺍﻷﺯﻫﺮ، ﺭﺑﻤﺎ ﺑﻔﻀﻞ ﻋﺪﻡ ﺗﺨﺮﺟﻪ ﻓﻰ ﺍﻷﺯﻫﺮ، ﻣﻦ ﺗﻔﻨﻴﺪ ﻟﻘﻀﻴﺔ ﺗﻘﺒﻠﺘﻬﺎ ﺍﻷﻣﺔ ﺑﺎﻹﺟﻤﺎﻉ (ﻛﻤﺎ ﻳﻘﻮﻟﻮﻥ)، ﻭﻓﺎﺗﺖ ﻋﻠﻰ ﺍﻷﺋﻤﺔ ﺍﻷﻋﻼﻡ، ﻭﻟﻤﺎﺫﺍ ﻟﻢ ﻳﻠﺤﻆ ﺭﺋﻴﺲ ﻗﺴﻢ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﺑﺎﻷﺯﻫﺮ ﻫﺬﺍ ﺑﺪﻻً ﻣﻦ ﺃﻥ ﻳﺘﺤﻔﻨﺎ ﺑﻔﺘﻮﻯ ﺇﺭﺿﺎﻉ ﺍﻟﻜﺒﻴﺮ؟ ! ﻣَﻦ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﺒﺎﺣﺚ ﺍﻟﺬﻯ ﻗﺎﻡ ﺑﻬﺬﺍ ﺍﻟﺘﺤﻘﻴﻖ؟ ﺇﻧَّﻪ ﺍﻷﺳﺘﺎﺫ ﺇﺳﻼﻡ ﺑﺤﻴﺮﻱ، ﻭﺟﺎﺀ ﺑﺤﺜﻪ ﻓﻰ ﺍﻟﻌﺪﺩ ﺯﻳﺮﻭ ( ﺃﻱ ﻗﺒﻞ ﺍﻷﻭﻝ) ﺹ 21 ﻣﻦ ﺟﺮﻳﺪﺓ ﺍﻟﻴﻮﻡ ﺍﻟﺴﺎﺑﻊ ﺍﻟﺬﻱ ﺻﺪﺭ ﻓﻰ 15/7/2008
~
যাইহোক, ঐতিহাসিক সত্যগুলো নিয়ে আসার পূর্বে প্রথমে জেনে নিই, উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনকথা :
~
নাম: আয়েশা। উপনাম: উম্মে আব্দুল্লাহ। উপাধি : সিদ্দিকা, হুমায়রা। খেতাব: উম্মুল মু’মিনীন। পিতার নাম: আবূ বকর। মাতার নাম: উম্মে রুম্মান।
~
হাদিস শাস্ত্রে হযরত আয়েশা (রা)-এর অবদান অনেক। তিনি অত্যন্ত জ্ঞানবতী ও মহতী ছিলেন। মহানবী (সা)-এর জীবনের বহু ঘটনা ও যুদ্ধ বিগ্রহ বিষয়ে তিনি ওয়াকিফহাল ছিলেন। তিনি কবিতা চর্চাও করতেন। মুসনাদে আহমদে তার রেওয়ায়েত সমূহ ২৫৩ পৃষ্ঠাব্যাপী লিপিবদ্ধ রয়েছে। মহানবী (সা) গৃহাভ্যন্তরে যা কিছু করতেন সে সম্পর্কে হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনার উপর বেশি নির্ভর করা হয়। অনেক সাহাবি ও তাবেয়ী তাঁর সূত্রে হাদিস বর্ণনা করেছেন।
তাঁর বোনের ছেলে হযরত উরওয়া ইবনে যুবায়ের এবং ভাতিজা কাসিম ইবনে মুহাম্মদ তাঁর থেকে অধিক সংখ্যক হাদিস বর্ণনা করেছেন। হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ২২১০ (দু’ হাজার দু’শত দশ)। “মুকছিরীন” স্তরের একজন হাদিস বর্ণনাকারী ছিলেন। সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী ৭ জন সাহাবির মধ্যে হযরত আয়েশা (রা)-এর অবস্থান ছিল তৃতীয়।
হযরত আয়েশা (রা) তিনি ৫৭ মতান্তরে ৫৮ হিজরীতে ৬৬/৬৭ বছর বয়সে বিশিষ্ট সাহাবি হযরত মু’আবিয়া (রা)-এর খিলাফতকালে ১৭-ই রামাদ্বান মদিনায় ইন্তেকাল করেন। ইন্নাল্লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
(তথ্য সূত্র : আল হাদিস ওয়া উসূলুল হাদিস : ৬৪৪/ফাযিল স্নাতক প্রথমবর্ষ ‘১২-‘১৩ ইং)।

যাইহোক, এবার ঐতিহাসিক সত্যগুলো নিয়ে আসি:

হাবিবুল্লাহ হুজুরেপাক (সাঃ) এর সাথে আয়েশা (রাঃ) এর বিয়ে হয় তৃতীয় হিজরী সনের শাওয়াল মাসে বা ৬২৩-৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ।
যদিও বলা হয়, হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর জন্ম ৬১৪ খৃষ্টাব্দে কিন্তু সহীহ বুখারীতে এসেছে আল কোরআনের ৫৪ তম অধ্যায় নাজিলকালে আয়েশা (রাঃ) একজন কিশোরী (Jariyah) বয়স্কা ছিলেন।
উল্লেখ্য ৫৪তম উক্ত অধ্যায় নাযিল হয় ৬১২ খৃষ্টাব্দের দিকে। সে হিসাবে হযরত আয়েশার বয়স তখন ১০ বছর হলেও ৬২৩-৬২৪ খৃষ্টাব্দ সালে তাঁর বয়স কোনো ভাবেই ২০ বছরের নিচে নয়।
(Sahih Bukhari, kitabu’l-tafsir, Arabic, Bab Qaulihi Bal al- sa`atu Maw`iduhum wa’l-sa`atu adha’ wa amarr)
অধিকাংশ বর্ণনাকারির মতে হযরত আয়েশা (রাঃ) বদরের যুদ্ধ (৬২৪ খৃষ্টাব্দে) এবং ওহুদের যুদ্ধ (৬২৫ খৃষ্টাব্দে) ইত্যাদিতে অংশগ্রহন করেছেন।
উল্লেখ্য যে রাসুল (সাঃ) এর বাহিনীতে ১৫ বছরের কম বয়স্ক কেউ গ্রহণযোগ্য ছিলনা এবং তাদের ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।
সুতরাং সেসময় যে হযরত আয়েশা’র বয়স ৬ বা ৯ ছিলনা, তা বলাই বাহুল্য।
A narrative regarding Ayesha’s participation in the battle of `Uhud is given in Bukhari, (Kitabu’l-jihad wa’l-siyar, Arabic, Bab Ghazwi’l-nisa’ wa qitalihinna ma`a’lrijal; that all boys under 15 were sent back is given in Bukhari, Kitabu’l- maghazi, Bab ghazwati’l- khandaq wa hiya’l-ahza’b, Arabic).
অধিকাংশ ইতিহাসবিদ মতে, হযরত আয়েশার বোন আসমা ছিলেন তাঁর চেয়ে দশ বছরের বড়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, আসমা ৭৩ হিজরী সনে যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ১০০ বছর। সে হিসাবে ১লা হিজরীতে তাঁর বয়স হয় ২৭ বছর। তাহলে সে হিসেবে হযরত আয়েশার বয়স যে তখন ১৭ এর কম ছিলনা, তা বোঝা যায়। তাহলে ৬২৩-৬২৪ খৃষ্টাব্দ তাঁর বয়স ১৮/১৯ বছর।
(For Asma being 10 years older than Ayesha, see A`la’ma’l- nubala’, Al- Zahabi, Vol 2, Pg 289, Arabic, Mu’assasatu’l- risalah, Beirut, 1992. Ibn Kathir confirms this fact, [Asma] was elder to her sister [Ayesha] by ten years” (Al- Bidayah wa’l- nihayah, Ibn Kathir, Vol 8, Pg 371, Arabic, Dar al-fikr al-`arabi, Al-jizah, 1933).
For Asma being 100 years old, see Al-Bidayah wa’l-nihayah, Ibn Kathir, Vol 8, Pg 372, Arabic, Dar al-fikr al- `arabi, Al-jizah, 1933). Ibn Hajar al-Asqalani also has the same information: “She [Asma (ra)] lived a hundred years and died in 73 or 74 AH.” Taqribu’l-tehzib, Ibn Hajar Al- Asqalani, Pg 654, Arabic, Bab fi’l-nisa’, al- harfu’l-alif, Lucknow).
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আল তাবারী’র বই (Tarikhu’l-umam wa’l-mamlu’k,) থেকে পাওয়া যায়, হযরত আবু বকর (রাঃ) এর চার সন্তান ছিলেন যাঁরা সকলেই ইসলামপূর্ব যুগে জন্মগ্রহন করেন। (ইসলামপূর্ব যুগ ৬১০ খৃষ্টাব্দ শেষ হয়)। তাহলে নিশ্চয়ই হযরত আয়েশা (রাঃ) এর জন্ম ৬১০ খৃষ্টাব্দ এর পূর্বে। সে হিসাবেও তিনি বিবাহের সময় ৬/৯ বছর বয়স্কা ছিলেন না।
Tarikhu’l-umam wa’l-mamlu’k, Al-Tabari, Vol 4, Pg 50, Arabic, Dara’l-fikr, Beirut, 1979).
আরেক প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে হাইসাম থেকে জানা যায় হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত উমর ইবন আল খাত্তাব (রাঃ) এর বেশ আগে ইসলাম গ্রহন করেন। (উমর ইবন আল খাত্তাব (রাঃ) ৬১৬ খৃষ্টাব্দে ইসলাম গ্রহন করেন)। আবার হযরত আবু বকর (রাঃ) ইসলাম গ্রহন করেন ৬১০ খৃষ্টাব্দে।
সুতরাং হযরত আয়েশা (রাঃ) ও ৬১০ এর কাছাকাছি সময়েই ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন। তার অর্থ আবারো দাঁড়ায় যে তিনি ৬১০ খৃষ্টাব্দের আগেই জন্মগ্রহন করেছিলেন এবং কোন ধর্ম গ্রহন করবার নূন্যতম বয়স (৬/৭ হলেও) তাঁর ছিল। তাহলে ৬২৩-৬২৪ সালে তার বয়স প্রায় ১৮-২০ হয়।
(Al-Sirah al- Nabawiyyah, Ibn Hisham, vol 1, Pg 227 – 234 and 295, Arabic, Maktabah al- Riyadh al- hadithah, Al- Riyadh)
হাম্বলি মাযহাবের ইমাম, আহমাদ ইবনে হাম্বাল তাঁর মুসনাদগ্রন্থে (৬/২১০) উল্লেখ করেছেন, বিবি খাদিযাহ (রাঃ) এর মৃত্যুর পরে (৬২০ খৃষ্টাব্দ) হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্য খাওলাহ خولة নামের একজন ২টা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। যার মধ্যে হযরত আয়েশার (রাঃ) এর কথা উল্লেখ করবার সময় একজন পূর্ণবয়স্ক যুবতী হিসেবেই উল্লেখ করেন কোন ছোট্ট শিশু طفل/Baby হিসেবে নয়।
(Musnad, Ahmad ibn Hanbal, Vol 6, Pg 210, Arabic, Dar Ihya al-turath al- `arabi, Beirut).
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও সহিহ বুখারীর অন্যতম ভাষ্যকার ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ)-এর একটি কিতাবের নাম ﺍﻹﺻﺎﺑﺔ ﻓﻲ ﺗﻤﻴﻴﺰ ﺍﻟﺼﺤﺎﺑﺔ (আল-ইছাবাহ ফী তাময়ীঝিস সাহাবাহ) ।
কিতাবটির ৪র্থ খণ্ডের ৩৭৭ নং পৃষ্ঠায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, হযরত ফাতেমা (রা)- এর জন্মের ৫ বছর পর হযরত আয়েশা (রা) জন্মগ্রহণ করেন। আর ফাতেম (রাঃ) এর জন্মের সময় রাসুল (সাঃ) এর বয়স ছিল ৩৫ বছর। সে হিসেবে আয়েশা (রাঃ) এর জন্মের সময় মুহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স ৪০ হবার কথা।
ফলে তাঁদের বিয়ের সময় আয়েশা (রাঃ) ৬/৯ না, বরং ১৪-১৫ বছর বয়স হবার কথা।
(Al-isabah fi tamyizi’l- sahabah, Ibn Hajar al- Asqalani, Vol 4, Pg 377, Arabic, Maktabatu’l- Riyadh al- haditha, al- Riyadh,1978)
ওপরের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হলো হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে বিয়ের সময় আয়েশা (রাঃ) যে ৬/৯ বছরের শিশু ছিলেননা সেটাই প্রমাণ করা।
জ্ঞাতব্য :
আর কোনো হাদীস যদি আল কোরআনের নির্দেশনার সাথে অসামাঞ্জস্যপূর্ণ হয় তাহলে নিশ্চিতভাবেই সেই হাদীসের ওপর ভরসা রাখা যুক্তিযুক্ত না। তা সে বুখারী মুসলিম বা সমস্ত সিহাহ সিত্তাতেই থাকুকনা কেন। আর এই বৈপরিত্য ধরবার জন্য নিজেদের বিবেককেও ব্যাবহার করা উচিত সকল মুসলমানের।
বিখ্যাত স্কলারদের মতে আয়েশা (রা.) এর বিয়ের সময় বয়স ৯ বছর ছিলনা বরং তার বয়স কিছুতেই ১৭ বছরের কম হতে পারেনা এবং সম্ভবত তখন তার বয়স ১৯ বছর ছিল। আসলে এ বিষয়ে আমরা কম জেনেই অনুমানের আশ্রয় নিই। বিখ্যাত স্কলার আদিল সালাহি এ ব্যপারে কি বলছেন পড়ুন :
বিশিষ্ট স্কলার আদিল সালাহি এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাব দেন, যেটি প্রকাশিত হয় আরব নিউজে ৭ মার্চ ২০০৩ তারিখে।
তিনি বলেন “এ প্রশ্নটি ইসলাম এবং রাসুল (সা.)- এর ব্যক্তি চরিত্রের প্রতি আক্রমণ বৃদ্ধির সংগে সংগে বার বার উঠে আসছে। কিন্তু ইসলাম অথবা রাসুল (সা.)-এর চরিত্র এবং ব্যবহারে এমন কিছু নাই যার জন্য আমাদের ক্ষমা চাওয়ার বা বিব্রত বোধ করার প্রয়োজন আছে। তারপরও রাসুল (সা.)-এর সাথে আয়েশা (রা.)-এর বিয়ে এবং সে সময় তার বয়স প্রসংঙ্গে কিছু আলোচনা করা যেতে পারে যাতে প্রমাণ হয় এব্যপারে আদৌ অভিযোগ করার মত কিছুই নাই। এ ব্যপারে যে বর্ণনাটি সবচেয়ে বেশী উদ্ধৃত হয় তা হচেছ, রাসুল (সা.) যখন বিয়ের প্রস্তাব দেন তখন আয়েশা (রা.)-এর বয়স ছিল ছয় এবং তিনি যখন তাকে বিয়ে করেন তখন তার বয়স ছিল নয়। মানুষ এটাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে গ্রহন করে থাকে।
কিন্তু যখন আমরা এসব বর্ণনা এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্ত বিষয়গুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করি, তখন আমরা দেখতে পাই, এসব বর্ণনা এমনকি প্রাথমিক নিরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে পারেনা।
সর্বপ্রথম আমাদের যে বিষয়টি বুঝতে হবে তা হচ্ছে, রাসুল (সা)-এর সময় আরব সমাজের অধিকাংশই ছিল নিরক্ষর এবং খুব কম লোকই লিখতে বা পড়তে পারত। বড় বড় ঘটনাগুলোর সন তারিখ হিসেব রাখার জন্য যেখানে কোন নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হত না, সেখানে মানুষের জন্ম মৃত্যুর তারিখ হিসেব রাখার কথাতো বাদই দেয়া যায়।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমরা পড়ি, রাসূল (সা.) জন্মগ্রহন করেছেন ‘হাতির বছরে’। হাতির বছর বলতে বোঝায় সেই বছর যেবার আবিসিনিয়ার সেনাপতি ইয়েমেন থেকে মক্কা এসেছিল এক বিরাট সেনাবাহি নী নিয়ে কাবা ঘর ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে। একটি বড় হাতি সৈন্য বাহিনীর সামনে মার্চ করে আসছিল আর তাই ঘটনাটি এবং বছরটি হাতির নামে পরিচিত হয়। রাসূল (সা.)-এর সময় আরবে মানুষের বয়স সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো বিভ্রান্তিকর এবং অনির্দিষ্ট ছিল।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সাধারণ ধারণা হচ্ছে, খাদিজা (রা.)-এর সাথে রাসূল (সা.)-এর বিয়ের সময় রাসুল (সা.)-এর বয়স ছিল ২৫ অন্যদিকে খাদিজা (রা.)-এর বয়স ছিল ৪০।
“ইবনে হিশাম” রচিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সিরাতগ্রন্থে এরকম উল্লেখ থাকলেও সে সময় রাসুল (সা.)-এর বয়স সম্পর্কে আরো দু’টি ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে খাদিজা (রা.)-এর সাথে বিয়ের সময় রাসূল (সা.)-এর বয়স ছিল ৩০, অন্যটিতে বলা হয়েছে ২৯।
সে সময় খাদিজা (রা.) বয়স কত ছিল সে সম্পর্কেও বর্ণনার বিভিন্নতা আছে । কোথাও বলা হয়েছে সে সময় তার বয়স ছিল ৩৫ কোথাও বলা হয়েছে ২৫। রাসূল (সা.)-এর সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যদের একজন ছিলেন রাসূল (সা.)-এর চাচাতো ভাই ইবনে আব্বাস (রা.)। তার থেকে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে তিনি বলেছেন, বিয়ের সময় রাসূল (সা.) ও তার স্ত্রী উভয়ের বয়সই ছিল ২৮ বছর।
খাদিজা (রা.)-এর গর্ভে রাসূল (সা.)-এর ছয়টি সন্তান জন্মগ্রহন করেছে। এদিক থেকে বিচার করলে বিয়ের সময় তার বয়স চল্লিশ ছিল এমন ধারণা করার উপায় নেই, অথচ এটাই হচ্ছে সবচেয়ে প্রচলিত বর্ণনা। প্রকৃতপক্ষে তার বয়স এর চেয়ে অনেক কম হবার কথা। তার বয়স ২৮ অথবা ২৫ ছিল এমন বর্ণনাই অনেক বেশী যুক্তিসঙ্গত মনে করা যেতে পারে।
খাদিজা (রা.)-এর জীবদ্দশায় রাসূল (সা.) আর কাউকে বিয়ে করেননি এবং তিনি খাদিজার (রা.) সাথে ২৫ বছর কাটিয়েছেন। তার ইন্তেকালের পর যখন তিনি খুবই চাপের মুখে ছিলেন, তখন একজন মহিলা সাহাবী তাকে পরামর্শ দিয়ে বললেন, তার বিয়ে করা উচিৎ যাতে তিনি দিনের দীর্ঘ প্রচারকাজ শেষে বাড়িতে একজন সঙ্গিনী পান এবং স্বস্তি লাভ করতে পারেন। সেই মহিলা তাকে দু’জনের কথা বললেন, একজন কুমারী আয়েশা অন্যজন বিধবা সাওদা।
রাসূল (সা) তাকে দুজনের কাছেই প্রস্তাব নিয়ে যেতে বললেন। রাসূল (সা)- কে নতুন বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়ার উদ্দেশ্য ছিল তার জন্য একজন সঙ্গীনি এবং স্বস্তির ব্যবস্থা করা।
কিন্তু যারা বলতে চান যে আয়েশা (রা)-এর বয়স সে সময় ছয় বছর ছিল, তারা কি এটা বিশ্বাস করতে বলেন যে, ঐ মহিলা সাহাবীটি রাসূল (সা)-কে মাত্র ছয় বছরের একটি বালিকার সাথে বিয়ের তথা সঙ্গ লাভের প্রস্তাব করেছিলেন? বর্ণনাগুলো শুধু যৌক্তিকতার আলোকে বিচার না করে একে কিছু দালিলীক ভিত্তি প্রমাণ স্বাপেক্ষে বিবেচনা করা উচিৎ।
এজন্য আমরা “ইবনে ইসহাক” রচিত সিরাতগ্রন্থ দেখব। আর ইবনে ইসহাক রচিত সিরাতগ্রন্থ হচেছ সমস্ত সিরাত গ্রন্থগুলোর ভিত্তি এবং তুলনামূলক সবচেয়ে নির্ভুল।
সেখানে সেসব মুসলিমদের একটি তালিকা আছে, যারা ইসলামী দাওয়াতের শুরুর বছরগুলোতে ইসলাম গ্রহন করেছিলেন। সেই তালিকাটিতে প্রায় পঞ্চাশ জন মুসলিমের নাম আছে। যার মধ্যে আবু বকরের দুই কন্যা আসমা এবং আয়েশার নামও অন্তর্ভুক্ত আছে। সেখানে এটাও যোগ করা আছে যে তিনি সে সময় ছোট ছিলেন। এই তালিকায় আয়েশার নাম এসেছে বিশ নম্বরে। কিন্তু আমরা এর উপর তেমন গুরুত্ব আরোপ করবনা।
আমরা যে বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেব তা হচ্ছে, এ তালিকার সমস্ত মুসলিমই ইসলাম গ্রহন করেছিলেন নবুয়্যতের পঞ্চম বছরের আগে। কেননা ঐ বছরই আবিসিনিয়ায় মুসলমানদের প্রথম হিজরত সংঘঠিত হয় এবং ঐ তালিকায় এমন অনেকের নাম ছিল যারা এ হিজরতে অংশগ্রহন করেছিলেন।
~
সুতরাং বলতে পারি যে, বিয়ের সময় হযরত মা আয়েশা (রা)-এর বয়স ছয় বছর ছিল মর্মে প্রচলিত তথ্যটি ভুল ভুল ভুল। বরং তার বয়স কিছুতেই ১৭ বছরের কম হতে পারেনা এবং সম্ভবত তখন তার বয়স ১৯ বছর ছিল। আসলে এ বিষয়ে আমরা কম জেনেই অনুমানের আশ্রয় নিই।

♥ অপরাপর দুটি সহিহ হাদিস দ্বারা উপরুল্লিখিত লেখাকে চ্যালেঞ্জ এবং তার জবাব :
প্রিয় সুধী! বাহ্যিকভাবে অপরাপর দুটি সহিহ হাদিস দ্বারা আমার নাতিদীর্ঘ লেখাটি চ্যালেঞ্জ করার মত যথেষ্ট সুযোগও রয়েছে। আমি হাদিস দুটি এখানে উল্লেখপূর্বক সেগুলোর জবাব দেব, ইনশাআল্লাহ। হাদিস দুটি নিচে দেয়া হল—
.
১-
হযরত আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, আমি আল্লাহর রাসুলের উপস্থিতিতে পুতুল নিয়ে খেলা করতাম আমার বান্ধবীরাও আমার সাথে খেলত। যখন আল্লাহর রাসুল (সঃ) বাড়ীতে প্রবেশ করতেন, তখন ওরা পুতুলগুলো লুকিয়ে নিত। কিন্তু তিনি (সঃ) তাদেরকে আমার সাথে একত্রে খেলতে বলতেন। [সহিহ বুখারি, হাদিস নং-৬১৩০ ; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-২৪৪০ ]
.
২-
একবার রাসুল (সঃ) ঘরে কিছু পুতুল দেখতে পেয়ে আয়িশা (রাঃ) কে বললেন, এগুলো কী? তিনি (রাঃ) বললেন, এগুলো আমার পুতুল। এগুলোর মধ্যে একটি পাখাওয়ালা ঘোড়া ছিল। [সহিহ আবু দাউদ, হাদিস নং-২২৮১৩]
.
আমাদের জবাব:
.
আমরা হাদিস গুলোর অনেক জবাব দিয়েছি। তবে সংক্ষেপে এতটুকু জেনে নিন যে, ১নং হাদিসের বিষয়বস্তু হযরত আয়েশা’র বিয়ের আগের সময়ের সাথে এবং বাপের বাড়ির সাথেই সম্পর্কিত। কারণ, সাধারণত বাপের বাড়িতে থাকাকালেই বান্ধবীদের সাথে মেলামেশার সুযোগ থাকে। হাদিসের বর্ণনাভঙ্গি কিন্তু এটাই বুঝাচ্ছে। আর তখন হযরত আয়েশার বিয়ে হবার প্রশ্নই আসতে পারেনা। কারণ তখনো পর্যন্ত তিনি শিশুই ছিলেন। সুতরাং হাদিসটি সহিহ এবং বিশ্লেষণ এটাই। অতএব, এটি আমার নাতিদীর্ঘ তথ্যভিত্তিক রচনার বিরুদ্ধে যায়নি।
.
আর পরের হাদিসটির বিষয়বস্তু অবশ্য বিয়ের পরে ও স্বামীর বাড়িতে থাকাকালীন সময়ের সাথেই সম্পর্কিত। আর এখানে সূক্ষ্ণভাবে চিন্তা করলে বুঝবেন যে, এ হাদিসে হযরত আয়েশার (রা) বক্তব্যটি কিভাবে রয়েছে? এখানে তিনি পুতুলগুলো নিজের সেলপ বা আলমারিতে সযত্নে রেখে দেয়ার কথাই বলতে চেয়েছেন, কিন্তু পুতুল নিয়ে খেলাধুলা করতেন—এরকম কোনো কথারই তিনি বলেননি কিংবা বলার কোনো প্রমাণও নেই। হাদিসের ভাষ্য দেখুন: ” এগুলো আমার পুতুল। এগুলোর মধ্যে একটি পাখাওয়ালা ঘোড়াও ছিল।” (সহিহ আবু দাউদ, হাদিস নং-২২৮১৩ )।
.
অতএব বুঝা গেল যে, পরের রেওয়ায়ত দ্বারা হযরত আম্মাজান আয়েশা (রা) তিনি যেন বুঝাতে চেয়েছেন যে, আমি ইতিপূর্বে এ পুতুলগুলো নিয়ে বান্ধবীদের সাথে বাপের বাড়িতে খেলাধুলা করেছিলাম। বিয়ের সময় স্বামীর বাড়িতে স্মৃতিস্বারক হিসেবে সেগুলো সংগে করে নিয়েও আসি। স্বামীর বাড়িতে নিজের নিকট এগুলো যত্নের সাথে রেখে দিই। প্রিয় স্বামী মুহাম্মদ (সা) একদা এসব পুতুল দেখে পেললেন। অমনি তিনি এক প্রকারের বিস্ময়ের স্বরে জিজ্ঞেস করলেন “এগুলো কী, হে আয়েশা! “। হাদিসের বর্ণনাভঙ্গি এমনটাই বুঝাচ্ছে। একটু গভীর ভাবে চিন্তা করে হাদিস দুটো উপলব্ধি করতে হবে।
.
সুতরাং, বলা যায় যে, উপরুল্লিখিত হাদিস দুটো আপন আপন জায়গায় সঠিক। শুধুমাত্র আমাদের বুঝার সমস্যা। অতএব এ হাদিসও আমার নাতিদীর্ঘ লেখাটির বিরুদ্ধে যায়নি। কেননা, এ হাদিস দ্বারা আর যাইহোক—হযরত আয়েশা তিনি স্বামীর বাড়িতে থাকাকালেও পুতুল খেলেছেন এরকম কোনো কথা বুঝায়নি।
আশাকরি এবার সর্বসাধারণ মুসলিম এবং অমুসলিম সবার ভুল ভাঙ্গবে। আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে সহিহ কথা এবং বিশুদ্ধ তথ্য মেনে তা প্রচার করার তাওফিক দিন, আমীন।

মন্তব্য