রিও অলিম্পিক-২০১৬, কে কি পেল, কে পেলনা

১৭ দিনের মহাযজ্ঞ, পর্দা নেমে গেল রিও অলিম্পিকের, এখন চার বছরের অপেক্ষা টোকিওর জন্য। নিখুঁত কোনোভাবেই বলা যাবে না এই অলিম্পিককে। আয়োজনে সমস্যা, রিওর ছিনতাই ঝামেলা...কত কী! তবে এত সমস্যার মধ্যেও ঠিকই কিছু অনির্বচনীয় স্মৃতি দিয়ে গেছে রিও। কিছু ভালো, কিছু মন্দ। বিদায়রাগিণীতে সেসবের দিকে একবার চোখ ফেরানো যাক


পদকে সেরা:
 ৬৮ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র
অবিশ্বাস্য দাপটে যুক্তরাষ্ট্র সব মিলিয়ে জিতেছে ১২১টি পদক, যার মধ্যে ৪৬টি সোনা। সোনা তো বটেই, রিও অলিম্পিকে রুপা ব্রোঞ্জও সবার চেয়ে বেশি জিতেছে ফেল্প্স-লেডেকিদের দেশ। অলিম্পিকের ইতিহাসেই কোনো দেশের এমনসর্বজয়ীকীর্তি গড়ার সপ্তম ঘটনা এটি, ১৯৪৮ সালের পর প্রথম। ১২১ পদকের মধ্যে নিজের শেষ অলিম্পিক রাঙিয়ে যাওয়া মাইকেল ফেল্প্সেরই ৬টি, যার মধ্যে ৫টি সোনা। সব মিলিয়ে ক্যারিয়ারে ২৩টি সোনা ২৮টি অলিম্পিক পদক নিয়ে শেষ করেছেন কিংবদন্তি সাঁতারু। পাঁচটি করে পদক জিতেছেন কেটি লেডেকি সিমোন বাইল্সও। এত পরিচিত নামের ভিড়ে কিম রোড একটু আড়ালেই চলে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের শুটারও নিয়ে টানা ষষ্ঠ অলিম্পিকে সোনা জিতেছেন এবং ৩৭ বছরেরতরুণী ক্ষুধাটা সম্ভবত এখনো মেটেনি
সেরা সমাপ্তি: গতিমানব
বিশ্বক্রীড়ার সবচেয়ে বড় যজ্ঞ থেকে এর চেয়ে সুন্দর বিদায় আর কীভাবে হতে পারত! ১০০ মিটার রিলেতে সবার শেষ অ্যাঙ্কর ল্যাপে ছিলেন তিনি। ‘বিদ্যুৎগতি’ কী হতে পারে, সেটি চর্মচোখে দেখার সুযোগ করে দিয়ে জ্যামাইকাকে জিতিয়ে দিলেন সোনা। সমাপ্তিরেখায় চুমু খেলেন, এরপর পরিচিত সেই তিরন্দাজ উদ্যাপন। কে, নামটি নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না। উসাইন বোল্ট! এর আগে ১০০ ও ২০০ মিটারে সোনা জিতেছিলেন, ১০০ মিটার রিলেতে জিতে হয়ে গেল ‘ট্রিপল ট্রিপল’। আগেই জানিয়েছিলেন রিওই তাঁর শেষ অলিম্পিক, তাতে অভিযান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার তৃপ্তি নিয়েই বললেন, ‘আমার আর কিছুই প্রমাণ করার নেই।’ নিজেই বললেন, ‘আমিই সর্বকালের সেরা!’
সেরা কোচ: দাদিগিরি! 
খুবই সহজ তাঁর কোচিং-দর্শন—যখন মুখ থেকে হাসি সরে যাবে, গলার স্বর কঠিন হয়ে যাবে, বুঝবে সময় এসেছে সিরিয়াস হওয়ার। একটু ‘দাদি-দাদি’ ভাব আছে না পরামর্শটার মধ্যে? তাই তো! ৭৪ বছর বয়সী অ্যানস বোথাকে তো এই নামেই ডাকা হয়—দাদি। কে এই বোথা? ৪০০ মিটার স্প্রিন্টে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে সোনা জেতা ফন নিকার্কের কোচ। সোনা জয়ের পর দক্ষিণ আফ্রিকান স্প্রিন্টারের মুখেও ছিল কোচের প্রশংসা, ‘অসাধারণ একজন মহিলা তিনি। ওঁর কাজই ওঁর হয়ে কথা বলে।’
খেলোয়াড়ি মনোভাব: অলিম্পিক চেতনা 
অলিম্পিকে একটি পদক জেতার জন্য সম্ভব-অসম্ভব কত কিছুই করেন অ্যাথলেটরা। আজন্মলালিত স্বপ্নের পেছনে দৌড়ে পাশের প্রতিযোগী পড়ে গেল কি না, সেটিরও খোঁজ রাখার সময় হয়তো থাকে না। কিন্তু রিওতে মেয়েদের ৫ হাজার মিটারের সেমিফাইনালে ঠিক উল্টোটাই করলেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাবি ডি’অ্যাগোস্টিনো ও নিউজিল্যান্ডের নিক্কি হাম্বলিন। দৌড়াতে গিয়ে পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পড়ে যান ট্র্যাকে, পরে একে অন্যকে সাহায্যও করেছেন উঠে দাঁড়াতে। শেষ পর্যন্ত লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ায় ডি’অ্যাগোস্টিনো ট্র্যাক ছেড়েছেন হুইলচেয়ারে করে, আর হাম্বলিন সমাপ্তিরেখা ছুঁয়েছেন সবার শেষে।
 
পদক জেতা হয়নি, কিন্তু অলিম্পিক চেতনার অনন্য উদাহরণ রেখেই বিদায় নিলেন দুজন।
সেরা জুটি:
 খেলার বাইরেও
সেরা জুটি বেছে নেওয়াও কঠিন কিছু নয়, অ্যাস্টন ইটন তাঁর স্ত্রী ব্রিয়ানি থিসেন-ইটন। চার বছর আগে লন্ডন অলিম্পিকের মঞ্চেই বাগদান সেরেছিলেন দুজন। বিয়ে করেছেন তার এক বছর পর। এবার অলিম্পিকের মঞ্চেও সারাক্ষণ একে অন্যের পাশে ছিলেন মি. মিসেস ইটন, উৎসাহ জুগিয়েছেন। সাফল্যও এসেছে, ডেকাথলনে যুক্তরাষ্ট্রকে সোনা জিতিয়েছেন অ্যাস্টন, ব্রিয়ানি কানাডাকে ব্রোঞ্জ জিতিয়েছেন হেপ্টাথলনে। অবশ্য ব্রিটেনের মেয়েদের হকি দলকে সোনা জেতানো সমকামী জুটি কেট রিচার্ডসন-ওয়ালশ হেলেন রিচার্ডসন-ওয়ালশকেও অনেকে সেরা জুটির সম্মান দিচ্ছেন।
বিব্রতকর নাটক: লোকটি লোক্টি
ইসরায়েলি জুডোকার সঙ্গে হাত না মেলানোয় মিসরের ইসলাম এল শেবাবির অলিম্পিক থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার ঘটনা বেশ আলোড়ন তুলেছে। তবে এটি সত্ত্বেও রিও অলিম্পিকের বিব্রতকর ঘটনা বললে চোখের সামনে চলে আসবে রায়ান লোক্টিরছিনতাইনাটক। অলিম্পিকে মোট ১২টি পদক জেতা যুক্তরাষ্ট্রের সাঁতারু হঠাৎই দাবি করে বসলেন, মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে তাঁকে লুটে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পুলিশের তদন্তের পর জানা গেল, আসলে লোক্টি তাঁর তিন সঙ্গী সাঁতারু রিওর এক ফিলিং স্টেশনে হাঙ্গামা বাধিয়েছেন, আর সেটি ঢাকতেই ফেঁদেছেন ছিনতাইয়ের গল্প। কিন্তু গল্পটা একেবারেই বাজার পেল না।
হঠাৎ তারকা: পুয়ের্তোরিকোর প্রথম
এটির জন্য খুব বেশি ভাবতে হয় কি! মনিকা পুচ ছাড়া আর কে হতে পারতেন? পুয়ের্তোরিকোর ইতিহাসে প্রথম অলিম্পিক সোনা জিতেছেন ২২ বছর বয়সী টেনিস-কন্যা, সেটিও কী দুর্দান্ত গল্প লিখে! প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার ঋণের ভারে জর্জরিত, জিকা ভাইরাস, মাতৃমৃত্যুর মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে নিয়মিত লড়তে হওয়া পুয়ের্তোরিকোকে সোনার হাসিতে ভাসিয়েছেন মেয়েদের টেনিসে ৩৪ নম্বর র্যা ঙ্কিংধারী পুচ। সোনালি যাত্রায় হারিয়েছেন বিশ্বসেরা পাঁচ টেনিস খেলোয়াড়ের দুজনকে, ফাইনালেই তো হারিয়েছেন র্যা ঙ্কিংয়ের নম্বরে থাকা অ্যাঞ্জেলিক কারবারকে। সোনা জেতার পর গায়ে পুয়ের্তোরিকোর পতাকা জড়িয়ে বলেছিলেন, ‘যা করেছি, সেটি করার মানে...সবকিছু করে ফেলা!’
অলিম্পিক সোনার মহিমাই তো সেখানে।
সেরা কথা চালাচালি: সাবেক গুরু-শিষ্য
চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল, কথাটাকে যেন সত্যি প্রমাণ করেছেন পিয়া সুন্ডাগ হোপ সোলো। একসময়ের যুক্তরাষ্ট্রের মেয়েদের দলের কোচ সুন্ডাগ এবার রিওতে গেছেন সুইডেনের মেয়েদের দায়িত্ব নিয়ে। সুইডদের কাছেই টাইব্রেকারে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছে টানা চতুর্থ সোনার স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া মার্কিন মেয়েরা। কিন্তু ঝামেলা বাধালেন যুক্তরাষ্ট্রের গোলকিপার সোলো। ম্যাচের পর বলে বসলেন, ‘এক দল কাপুরুষের কাছে হারলাম আমরা।খোঁচাটা সহ্য হয়নি সোলোর সাবেক কোচ সুন্ডাগের, তিনিও জবাব দিলেন, ‘যদি জয় আসে, তাহলে কাপুরুষ হওয়াও খারাপ নয়।
মাঠের বাইরের সেরা: তারকার নায়ক
জ্যাক এফ্রন অলিম্পিকে আলোচনায় আসেন সিমোন বাইল্সের কল্যাণে। ১৯ বছর বয়সী বাইল্স আর্টিস্টিক জিমন্যাস্টিকসে মোট পাঁচটি পদক এনে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রকে, চারটিই সোনা। অলিম্পিকে আসার আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, এফ্রনের প্রতিপ্রেমভাবআছে তাঁর। যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্রতারকাও তাই বাইল্সকে বিস্ময় উপহার দিতে চলে এলেন রিওতে। নিয়ে মজাও হয়েছে। এফ্রনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর বাইল্স মজা করে টুইট করেছিলেন, ‘ আমাকে এরই মধ্যেমিসেস এফ্রনবলে ডাকতে শুরু করেছে।যা দেখে বাইল্সের সত্যিকারের বন্ধু আবার এফ্রনকে টুইট করেছেন, ‘এফ্রন, আমি ওকে আগে দেখেছি! আমার বান্ধবী।কিছুটা ঈর্ষার সুর? থাকলই বা।
সেরা ব্রাজিলিয়ান মুহূর্ত: নেইমারের শেষ শট!
রাফায়েলা সিলভার গল্পই ছিল কোনো হলিউড চলচ্চিত্রের মতো। রিওর পাশের সন্ত্রাসকবলিত বস্তি এলাকা ‘সিটি অব গড’ থেকে উঠে এসে জুডোতে সোনা জিতেছেন ব্রাজিলিয়ান মেয়ে। এটিই ব্রাজিলিয়ানদের কাছে সবচেয়ে সেরা মুহূর্ত হয়ে থাকত, কিন্তু বদলে গেল গল্পের মতো সমাপ্তিতে। এত বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে অলিম্পিক ফুটবলে সোনা জিতেছে ব্রাজিল, সেটিও কী নাটকীয়তায়। নির্ধারিত সময়ে সমতার পর নিষ্পত্তি হলো টাইব্রেকারে। তাতেও চার শট শেষে স্কোর ৪-৪! এরপরই এল নাটকের মতো মুহূর্তটা। জার্মানির শেষ শট ফিরিয়ে দিলেন ব্রাজিল গোলকিপার। ব্রাজিলের শেষ শট নিতে এলেন ব্রাজিলেরই স্বপ্নসারথি—নেইমার। তাঁর শট জালে জড়াতেই গগনবিদারী চিৎকারে ভেসে গেল মারাকানা স্টেডিয়াম। এত বছরের অলিম্পিক-ভূত তাড়াল ব্রাজিল। 
অলিম্পিক আয়োজন নিয়ে বিরোধিতা, ১৬ দিনের নানান ঘটন-অঘটন সব ভুলে গেলেন ব্রাজিলিয়ানরা। এমন আনন্দের মুহূর্তে সেসব মনেই বা রাখে কে! সূত্র: ইউএসএটুডে।


মন্তব্যসমূহ