কেমন পাত্র চাই?


তরুণীদের কাছে প্রশ্ন 
কেমন পাত্র চাই?
l জীবনসঙ্গী হিসেবে একজন বুদ্ধিমান, বিনয়ী ও মেধাবী মানুষ চাই। যার চরিত্র ভালো হবে এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা থাকবে।
সারাহ্ সুলতানা, পরামর্শক, এফএইচআই ৩৬০, ঢাকা।
l দেখতে সুদর্শন, গোছানো স্বভাবের ছেলেকে বিয়ে করতে চাই। যার মনমানসিকতা উদার হবে, আমার পরিবারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখবে। আর বিয়ের ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিজীবী আমার ও আমার পরিবারের প্রথম পছন্দ।


লতিফা মমতাজ
পরিসংখ্যান বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
l আমি যাকে বিয়ে করব সে যেমন আমার কাজে বাধা দেবে না, আমিও তার কাজে বিঘ্ন ঘটাব না। দুজন দুজনকে সব কাজে সাহায্য করব। আমি সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে চাই। আমি চাই পাত্রও একই মানসিকতার হবে। অর্থাৎ আমরা একসঙ্গে এগিয়ে যাব পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে।
উজ্জয়িনী আচার্য
প্রকল্প সহযোগী, ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন।
l পাত্রকে অবশ্যই প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিজীবী হতে হবে। অর্থাৎ তার একটি নির্দিষ্ট আয়ের উত্স থাকবে। তবে খুব বেশি টাকাপয়সার দরকার নেই। তার সঙ্গে আমার মানসিক বিষয়গুলোর মিল থাকতে হবে। তাকে সৎ ও পরোপকারী হতে হবে। এ ছাড়া বিয়ের পর শুধু বউ নয়, তার পরিবার ও বাবা-মাকে অনেক প্রাধান্য দিতে হবে।
তানজিনা আক্তার
চতুর্থ বর্ষ, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
l পাত্রকে অবশ্যই মানুষ হিসেবে সৎ হতে হবে, ভালো চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ভালো থাকবে এবং দায়িত্ববান হবে, যাতে সবকিছু ভালোভাবে ম্যানেজ করতে পারে।
ফাতেমা আক্তার, দর্শন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
l পাত্র পছন্দ করার ক্ষেত্রে প্রথমেই আমি দেখব তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, তারপর পরিবার। পরিবারটি হতে হবে ছিমছাম, গোছানো; যেখানে কেউ কারও বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। আর সরকারি চাকরিজীবী হলে ভালো হয়, বেসরকারি হলেও অসুবিধা নেই।
মুনতাযিমা হাসান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
l একজন মানুষকে বিয়ে করার আগে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখব। তারপরেই দেখব সে কী করে, তার পরিবার কেমন, তার চালচলন কেমন। আর দেখব তার বন্ধুবান্ধবকে। কারণ, একজন মানুষ যে মানসিকতার, তার বন্ধুরাও সেই মানসিকতার হয়।
আইরিন জাহান
স্নাতকোত্তর, সমাজকল্যাণ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
l আমি যাকে বিয়ে করব তাকে কেয়ারিং হতে হবে, তিনি আমাকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেবে, সন্দেহপ্রবণ হওয়া চলবে না। সর্বোপরি তাকে একজন ভালো মানুষ হতে হবে।
কাশফিয়া হাসান
চতুর্থ বর্ষ, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ধারাটা কেমন?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে পাত্র-পাত্রীর চাহিদার ধরন। এমনটাই বললেন বিয়ের মধ্যস্থতাকারী (ম্যারেজ মিডিয়া) বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীরা। তাঁদের মতে, আগে পাত্রীর ক্ষেত্রে দেখা হতো মেয়ের বাবার অর্থনৈতিক অবস্থা, এখন দেখা হয় মেয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা। সানাই ম্যারেজ মিডিয়ার স্বত্বাধিকারী সৈয়দ জুলফিকার হোসেন বলেন, ‘মেয়ের বাবার বাড়ি-গাড়ি নয়, এখন পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা বলেন, একজন ভালো, সুন্দরী (ফরসা হতে হবে এমন নয় মিষ্টি চেহারা) আর শিক্ষিত মেয়ে চাই।’
ম্যারেজ মিডিয়ার স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ রায়হান বলেন, ‘আজকাল পাত্রী পছন্দ করার ক্ষেত্রে আমরা দেখছি আরও দুটো বিষয়কে কেউ কেউ প্রাধান্য দিচ্ছেন। এক. মেয়েকে ধার্মিক হতে হবে, দুই. পেশার প্রতি খুব বেশি নিবেদিত হওয়া যাবে না।’ এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘এখন সংসার বেশি ভাঙছে। কোেনা কোেনা ছেলেপক্ষের ধারণা ধর্মকর্ম করে আর সংসারী মেয়েরা পাত্রী হিসেবে ভালো হয়।’
রাজলক্ষ্মী ম্যারেজ মিডিয়ার স্বত্বাধিকারী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘মেয়ে সুশ্রী হলে ছেলে পক্ষ অনেক বিষয়ে ছাড় দেয়। সুন্দরের প্রতি সবারই আলাদা একটি খেয়াল থাকে। চাকরিজীবী পাত্রীও এখন অনেকে পছন্দ করছে।’
ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত পাত্রের চাহিদা বেশি। তবে পাত্র পছন্দের ক্ষেত্রে এখন একটা পরিবর্তন এসেছে। সরকারি চাকরিজীবী পাত্রের চাহিদা আগে বেশি থাকলেও এখন বেসরকারি চাকরিজীবী পাত্রেরও বেশ চাহিদা। পাত্রীরা এখন জীবনযাপনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা চায়, পছন্দমতো চাকরি করতে চায়। পড়াশোনা করতে চায় বলে জানান নুরুল ইসলাম। পাত্র যেন মাদকাসক্ত না হয়, সে বিষয়ে খুব সতর্ক পাত্রীর অভিভাবক। তবে অঞ্চল নিয়ে পাত্র-পাত্রীর উভয় পক্ষেরই একটা পছন্দ থাকে বলে জানান তাঁরা।
শিক্ষাগত যোগ্যতাই সবার আগে
কী ধরনের পাত্র-পাত্রী পছন্দ—এ প্রশ্নের উত্তরে তরুণ-তরুণীরা দিয়েছেন নানান তথ্য। এসব মতামতে একটি বিষয়ে তরুণ ও তরুণীদের চাহিদা একই। তা হলো শিক্ষাগত যোগ্যতা। আর মেয়েরা বুদ্ধিমান, বিনয়ী, চরিত্রবান ছেলেকেই পছন্দের শীর্ষে রেখেছেন। তবে বেশির ভাগ মেয়েই পাত্র হিসেবে সরকারি চাকরিজীবী ছেলেকে পছন্দ করেন। এর কারণ হিসেবে তাঁরা বলেন, সংসারজীবনে একটি স্থিতিশীল অবস্থা থাকে। মেয়েরা বিয়ের পরেও নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে চান, চায় জীবনযাপনের অবাধ স্বাধীনতা। তবে ছেলেরা শিক্ষার পাশাপাশি পাত্রীর শারীরিক সৌন্দর্য বিশেষ করে গায়ের রং, উচ্চতা, গঠনকে প্রাধান্য দেন। আধুনিক মেয়ে যেমন অনেকের পছন্দ তেমনি ঘরোয়া, ধর্মপরায়ণ পাত্রীও অনেকের পছন্দ। তবে ছেলে-মেয়ে উভয়েই মানসিক মিল হবে—এমন একজন জীবনসঙ্গী বেছে নিতে চান। বয়সের বিষয়ে তেমন কোনো বিশেষ পছন্দ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান নেহাল করিম বলেন, ‘এখন পাত্র-পাত্রী উভয়েই খুব সচেতন। বেশির ভাগ সময় তাঁরা নিজেরাই পছন্দ করে বিয়ে করছেন। এ ক্ষেত্রে শারীরিক সৌন্দর্যের চেয়ে তাঁদের সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক মিলের বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, বিয়ের ক্ষেত্রে আইনি বন্ধনই বড় নয়, মানসিক বন্ধনটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
বিয়ের আগে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় দেখে একে অন্যকে পছন্দ করলেও মূল সংগ্রামটা শুরু হয় বিয়ের পরে। সমাজবিজ্ঞানীরা এমনটাই মনে করেন। একসঙ্গে সহাবস্থানের পূর্বশর্ত বিবেচক হওয়া। ছেলে-মেয়ে দুজনকেই বিবেচক হতে হবে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, আস্থা, বিশ্বাস রাখতে হবে। শুধু নিজের সুবিধা-অসুবিধে দেখলে চলবে না, সঙ্গীরটাও দেখতে হবে। বেশির ভাগ পরিবারে সঙ্গীর ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন নিয়ে মনোমালিন্য হয়ে থাকে। এটা দুজনকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। ছাড় দেওয়ার মনোভাব থাকতে হবে।
নেহাল করিমের মতে, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সৌন্দর্য বাহ্যিকভাবে দেখা যায় কিন্তু বিয়ের ক্ষেত্রে মানসিক দিকটা দেখা ভীষণ জরুরি। মানসিক বিষয়ে বেশি অমিল বা ঘাটতি থাকলে সংসারে বিপর্যয় নেমে আসবে। তিনি বলেন, ‘দেখা যাবে একজন শুনবে নজরুলসংগীত, একজন শুনবে র‍্যাপ। একজন ঘুরতে যেতে চায়, আরেকজন প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকেই বের হতে চায় না। এ নিয়ে শুরু হবে ঝামেলা। এ রকম করে করে সংসার যাবে ভাঙনের মুখে।’ বিয়ের আগে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে হবে একে অন্যের ভালো লাগা, মন্দ লাগা। বেশির ভাগ মিলে গেলেই না সংসারটি হবে সুখের-শান্তির। 
বিজ্ঞাপনে পাত্র-পাত্রী
জুন ও জুলাই মাসে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত পাত্র-পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন ঘেঁটে দেখা যায়, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সরকারি চাকরিজীবী, সেনাবাহিনীতে কর্মরত পাত্রের চাহিদা বেশি। পাশাপাশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত পাত্রদেরও বেশ কদর রয়েছে।
এ ছাড়া বিজ্ঞাপনগুলোতে পাত্রের যোগ্যতা হিসেবে শিক্ষার পাশাপাশি অভিজাত এলাকায় (ধানমন্ডি, গুলশান, বসুন্ধরা, বারিধারা) বাড়ি ও গাড়ি থাকা বিশেষ যোগ্যতা হিসেবে দেখানো হয়। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিজ্ঞাপনে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, লন্ডন, অস্ট্রেলিয়াসহ প্রবাসী উল্লেখ থাকে। এটা পাত্র-পাত্রী উভয়ের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। আর পাত্রীর ক্ষেত্রে তাঁর যোগ্যতা ধরা হয় সে সুন্দরী কি না, উচ্চতা কেমন, ভদ্র, নম্র, ধর্মমনা, ঘরোয়া মেয়ে কি না। তাঁদের পেশা হিসেবে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষিকা অগ্রগণ্য। এমনকি ‘অপূর্ব সুন্দরী’ পাত্রীও চাওয়া হয়, সঙ্গে যুক্ত থাকে সম্ভ্রান্ত পরিবার।

ব্যতিক্রমী কিছু বিজ্ঞাপনও দেখা যায়। এসবে উল্লেখ থাকে ডিভোর্সি, বিধবা, বিপত্নীক ও বয়স্ক ছেলে-মেয়েদের জন্য বিয়ের কথা। এ ছাড়া হিন্দু পাত্র-পাত্রীদের ক্ষেত্রে কোথাও নির্দিষ্ট বর্ণের হতে হবে উল্লেখ থাকে আর কোথাও লেখা থাকে অসবর্ণে আপত্তি নেই।

মন্তব্য